এজেন্সি ছাড়া নিজে নিজে ওমরাহ করে আসুন। আমার ২০ দিনের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু তথ্য তুলে ধরেছি।
ওমরাহ করার জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুতি থাকলে সর্বপ্রথম বিমানের ভাড়া দেখুন আপনার কাঙ্খিত তারিখের মধ্যে। যদি আপনার বাজেটের মধ্যে বিমান টিকিট পেয়ে যান তাহলে নুসুক এপস থেকে রিয়াজুল জান্নাহর এপয়েন্টমেন্ট দিয়ে দিন। ভিসার জন্য বিশ্বস্ত কাউকে দিয়ে ভিসা প্রোসেসিং করে নিবেন। চেষ্টা করবেন ২ টা জুম্মা সৌদি তে করার জন্য, ১ম জুম্মা মক্কায় এবং ২য় জুম্মা মদিনায়। রিয়াজুল জান্নাহ এপোয়েন্টমেন্ট ডেট এর উপর নির্ভর করে পুরো ওমরাহ প্লান টা সাজাতে পারেন।
বিমান টিকিটঃ যদি কোন বিশ্বস্ত এজেন্সি থাকে তাদের থেকে রিটার্ন টিকিট সহ করে নিতে পারেন। তবে বিমান টিকিট নিজে করাই সব চেয়ে ভালো যাওয়ার টিকিট ঢাকা-জেদ্দা এবং ফিরতি টিকিট মদিনা-ঢাকা। তবে টিকিট নিজে করাটাই সবচেয়ে ভালো। ১ টা ট্রানজিট নিয়ে আসা যাওয়া ৬০-৭০ হাজার টাকায় পেয়ে যাবেন।
জেদ্দা থেকে মক্কাঃ জেদ্দা এয়ারপোর্ট থেকে মক্কা প্রায় ৯৫ কিলোমিটার, এখান থেকে সরাসরি মক্কায় আসতে চাইলে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ রিয়েল ভাড়া চাইবে। লোকাল শেয়ারিং কার দিয়ে আসলে জনপ্রতি ভাড়া পরবে ৩০-৪০ রিয়েল।
মিক্বাত করাঃ ঢাকা থেকে যেই ফ্লাইটে ই আসেন না কেন সৌদিআরবের আকাশে প্রবেশের পর বিমানে ঘোষণা করা হয় মিক্বাত অতিক্রম করার সময়। অতএব বাংলাদেশ থেকে বা ট্রানজিট যেখানে হবে সেই স্থান থেকে এহরাম বেধে নিতে পারেন। মিক্বাত অতিক্রম করার সময় নিয়ত করে তালবিয়া পাঠ করতে হবে। আপনি যদি ২য়,৩য় বারের মত ওমরাহ করতে চান তাহলে মসজিদে আয়েশা থেকে মিক্বাত করে আসতে পারবেন।
সিম কার্ডঃ এয়ারপোর্টে অনেক দোকান আছে আপনি আপনার পাসপোর্ট এবং ভিসার ছবি, ফিঙ্গার দিয়ে সিম কার্ড কিনতে পারবেন। মনে রাখবেন সৌদি তে মোবাইল নেট খরচ অত্যাধিক।
অনেক মোবাইল অপারেটর কোম্পানি আছে এর মধ্যে STC, Zain সিমের নেটওয়ার্ক ভালো। ৪০ রিয়েল দিয়ে STC sawa visitor সিম কিনতে পারেন। বাংলাদেশে ১ ঘন্টা কল ফ্রী, ৫ জিবি নেট এবং ১৪ দিন মেয়াদ থাকে। ই-সিম এর জন্য “airalo” এপ থেকে সম্পূর্ণভাবে অনলাইনে ই-সিম কিনতে পারেন। মাত্র ৫ ডলার থেকে দাম শুরু তবে এই সিমে কোন নাম্বার থাকে না শুধু ইন্টারনেট কানেক্টিভিটি।
মক্কায় হোটেলঃ মক্কায় বাংলাদেশীদের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে মিস ফালা এরিয়া, এই এরিয়াতে সুবিধার পাশাপাশি ভোগান্তি ও আছে। প্রচুর দামাদামি করে হোটেল নিতে হবে যার কারনে আপনার সময় অপচয় হবে। মক্কায় যাওয়ার আগেই হোটেল বুকিং দিয়ে যাওয়া সবচেয়ে ভালো। বুকিং ডটকম অথবা এগোডা থেকে বুক করে যাওয়া যেতে পারে। বুক করার সময় মসজিদুল হারাম এর দূরত্ব থেকে বুকিং করবেন। আমি ছিলাম বিন লাদিন মসজিদ এর সামনে Beyza Hotel এ। সৌদি আরবে সিঙ্গেল রুম নাই বললেই হয়। ২ বেডের রুম নিতে হবে আর তুলনামূলক জনপ্রতি খরচ কম হবে ৪ বেডের রুম গুলো তে।
হোটেল খরচঃ মক্কা এবং মদিনায় সর্বনিম্ন বাংলাদেশি টাকায় ১০০০ এর মধ্যে রুম পেয়ে যাবেন তবে কিছু কিছু সময় হোটেল এর ভাড়া অনেক বেশি হয়। জনপ্রতি ১৫০০/২০০০ টাকা খরচে কম দূরত্বের স্টার মানের হোটেলে স্টে করতে পারবেন।
ওমরা শুরু করাঃ এহরাম বাধা অবস্থায় মক্কা চত্বরে প্রবেশ করুন, চেষ্টা করবেন 69,70,71 নাম্বার গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করার। এই গেট গুলো থেকে পবিত্র কাবার প্রথম ভিউ টা সুন্দর পাওয়া যায়। জীবনে প্রথম কাবা দেখার সাথে সাথে দোয়া করবেন এই সময় দোয়া কবুল হয়। গেট দিয়ে ঢুকে চলন্ত সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে যাবেন মাতাফ গ্রাউন্ড ফ্লোরে। ওমরা করার নিয়ম সহিহ শুদ্ধ ভাবে যেনে নিতে পারেন কোন একজন আলেম এর থেকে। অথবা বিশ্বস্ত ইউটিউব চ্যানেল থেকে দেখে নিবেন।
খাওয়া দাওয়াঃ মক্কা মদিনা উভয় স্থানেই প্রচুর বাংলাদেশি খাবার হোটেল পাবেন। এসব হোটেলে প্রায় সব ধরনের ই বাংলা খাবার পাবেন তবে দাম জেনে খাবেন। মক্কা মদিনা হওয়া সত্বেও তাদের চিন্তা ধারা দেশে ব্যবসা করার মতই। প্রতি বেলা জনপ্রতি প্রায় ১০০০ টাকা লেগে যাবে। ডাল ভাজি রুটি প্রায় ১৫০-২০০ টাকা পরবে। পানির বোতল ১ রিয়েল মানে ৩০ টাকা ২ লিটার বোতল ২ রিয়েল মানে ৬০ টাকা। তবে বাহিরে প্রচুর ফ্রী পানি বিতরন করে এছাড়া অনেক মসজিদে ফ্রীজে পানি রাখা আছে, চাইলে খেতে পারেন বা নিয়েও আসতে পারেন।
রাতের মক্কাঃ যেহেতু অত্যাধিক সওয়াবের স্থান তাই এখানে রাতের বেলা অবস্থান করা টা ভালো। এশার পর থেকে ফজর পর্যন্ত সারারাত থেকে এর পর রুমে গিয়ে ঘুমাতে পারেন যোহর পর্যন্ত। মাতাফ এরিয়ায় থাকতে হলে অবশ্যই এহরাম বাধা অবস্থায় থাকতে হবে, এছাড়া আপনাকে মাতাফে প্রবেশ করতে দিবে না। এই নিয়ম হাজী দের ভীড়ের উপর নির্ভর করে। এছাড়া আপনি অন্য যেকোন ড্রেস পরে মক্কা মদিনায় ঢুকতে পারবেন।
মক্কায় ঘুরে দেখবেনঃ জান্নাতুল মোয়াল্লা খাদিজা রাঃ এর কবর, মসজিদে জ্বীন সহ বেশকিছু নামকরা ঐতিহাসিক মসজিদ এবং নিদর্শন কাবা শরীফের একদম পাশেই অবস্থিত। এগুলিতে আপনি ১০ মিনিট হেটেই যেতে পারবেন। মক্কায় আসলে অবশ্যই জাবালে নূর (হেরা পর্বত) আর জাবালে সউর পাহাড়ে ঘুরে আসবেন। দুইটা পাহাড়েই রাতে বা সন্ধ্যায় যাওয়ার চেষ্টা করবেন। দিনে প্রচন্ড রোদ আর গরম থাকে এছাড়া রাতের ভিউ সুন্দর হয়ে থাকে। জাবালে নূরে যাওয়ার জন্য মক্কার সাপকো বাসস্ট্যান্ড থেকে মক্কা বাস পাবেন সরাসরি জাবালে নূরের গেটে নামতে পারবেন। পায়ে ভালো জোর এবং ভালো জুতা থাকলে এই পাহাড়ের একদম চুড়ায় উঠতে পারবেন। খুব গরম থাকলে , আপনি অবশ্যই সাথে পানি , ছাতা এবং লাঠি নিয়ে নিবেন। তবে সেখানে অনেক দোকান আছে।
মক্কা শহর থেকে কিছুটা দূরে মিনা এবং আরাফার ময়দান। সেখানে যাবার পথে শয়তান কে পাথর মারার জায়গাটি দেখতে পাবেন। আরাফাতের ময়দান দেখে ফেরার পথে জাবালে সউর পাহাড়ে যাবেন। এখান কার প্রতিটা বাক আপনার স্মৃতিতে থেকে যাবে আজীবনের।
মক্কা থেকে মদিনাঃ মক্কা থেকে মদিনার দূরত্ব প্রায় ৪৩৪ কিলোমিটার বাস, ট্রেন, শেয়ারিং করে যেতে পারেন। আমার কাছে সবচেয়ে সাশ্রয়ী মনে হয়েছে শেয়ারিং কারে যাওয়া। বাসে ভাড়া ১২০ রিয়েল মানে প্রায় ৩৬০০ টাকা। ট্রেনে ভাড়া ১৫০ রিয়েল প্রায় ৪৫০০ টাকা জনপ্রতি। আর শেয়ার কারে ভাড়া জনপ্রতি ৪০-৬০ রিয়েল বাংলাদেশি টাকায় ১২০০-১৮০০ টাকা।
রিয়াজুল জান্নাহঃ মদিনায় প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর রওজামোবারক জিয়ারত করার পর সকলের উদ্দেশ্য থাকে একবার রিয়াজুল জান্নাতে প্রবেশ করার জন্য। কিন্তু এখানে এপোয়েন্টমেন্ট ছাড়া প্রবেশ করার কোন উপায় নাই। অতএব ভিসা পাওয়ার পর পরই নুসুক (Nusuk) এপস থেকে রিয়াজুল জান্নাহ এপোয়েন্টমেন্ট ডেট বুকিং করে দিতে হবে।
মদিনায় খাবারঃ মদিনায় খাওয়া দাওয়া করার জন্য বেলাল মার্কেট জনপ্রিয়। এখানে বেশ কিছু বাঙ্গালী হোটেল পাবেন সেই সাথে পাকিস্থানি হোটেল ও আছে। খাবার এর মান মক্কা থেকে ভালো তবে দাম একই। আমরা বাঙ্গালী মার্কেট রূপসী বাংলা রেস্টুরেন্ট খাবার এর মান অসাধারণ।
মদিনায় ঘুরে দেখবেনঃ উহুদ পাহাড়, মসজিদে কুবা, মসজিদে কিবলাতাইন বা দুই কেবলার মসজিদ, উসমান রাঃ এর বাগান, জুম্মা মসজিদ, সাত মসজিদ খন্দক ইত্যাদি অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। বেলাল মার্কেট থেকে জিয়ারাহ বলে ট্যাক্সি ভাড়া করে নিতে পারেন। ওয়াদি জ্বীন বা জ্বীনের পাহাড়ে যাওয়ার জন্য ৬০-৮০ রিয়ালে ট্যাক্সি পেয়ে যাবেন। দামাদামি করে নিতে হবে।
এছাড়া মদিনা শহরে অনেক মিউজিয়াম এবং বিখ্যাত মসজিদ আছে, সেগুলো দেখতে পারেন। বদর যুদ্ধের প্রান্তরে যেতে পারেন সময় লাগে প্রায় ২ ঘন্টা। টপ টেন নামে একটা সুপারশপ আছে এখান থেকে যেকোন আইটেম পাবেন ১৩ রিয়ালে।
মদিনায় হোটেলঃ বেলাল মার্কেট এরিয়া তে প্রচুর হোটেল আছে তবে নিরিবিলি থাকতে চাইলে বাঙ্গালী মার্কেট বা টপটেন এর এরিয়া তে কমের মধ্যে হোটেল পেয়ে যাবেন। ২ জনের বেড ৫০ রিয়াল মানে ১৫০০ টাকা থেকে শুরু।
যমযমের পানিঃ যমযমের পানি এয়ারপোর্ট থেকে বুকিং এ দিয়ে দিতে পারবেন। ৫ লিটারের বোতল এয়ারপোর্টের ঢুকার আগে কাউন্টারে সাড়ে ১২ রিয়াল জমা দিয়ে কিনতে পারবেন। এই ৫ লিটার ছাড়া অন্য কোন পানি আনতে দিবে না।
এছাড়া প্রয়োজনীয় অনেক তথ্য ইউটিউবে পেয়ে যাবেন, যদি কোন তথ্য প্রয়োজন হয় ইনবক্স করতে পারেন, ইনশাআল্লাহ্ চেষ্টা করবো সহোযোগিতা করার।
আল্লাহ্ পাক আমাদের সকলকে মক্কা-মদিনায় ভ্রমণ করার তৌফিক দান করুক।
ছুম্মা আমিন।



